Title: বন্ধু হারানো বেদনা

বন্ধু হারানো বেদনা
মাহবুব আলম মুরাদ

জন্ম মফস্বর পল্লীর এক মধ্য বৃত্ত পরিবারে। পল্লী প্রকৃতি, গ্রামের সতেজ বাতাস আর সোনালী ফসলের মাঝেই এক পা দু পা করে বেড়ে উঠা। কখনো নিজেকে মাতিয়ে রাখা পুতুল খেলার মাঝে, কখনো চড়ুই বাতি রান্নার মাঝে, কখনো মায়ের আচলের নিচে মাথা লুকিয়ে, কখনো কাঁদা মাটি নিয়ে হাড়ি পাতিল, পুতুল তৈরীর মাঝে। কখনো বিকেলে খেলার মাঠে এক্কা ধোক্কা খেলার মাঝে, কখনো সোনালী ধানের মাঠে নিজেকে আড়াল করে। এভাবে চলতে থাকে আমার মধুর দিন গুলো। জীবন তরী চলতে চলতে পথি মধ্যে পরিচয় হয়ে যায় আমার বয়সী এক তরুনের সাথে। ক্রমান্বয়ে বন্ধুত্ব।
দুজনে ছিলাম একই গ্রামের পাশাপাশি দুটি বাড়িতে। হেসে, খেলে পেরিয়ে যেত দুজনের মধুর মুহুত্বগুলো। পড়াশুনাও করতাম একই বিদ্যালয়ে । বিদ্যালয় ছুটির পর দুজনে ছুটে যেতাম দূর দুরান্তে। কখনো পাশের বাড়ির মন্ডলের বাগান থেকে আম চুরি, কখনো জামরুল আবার কখনো পেয়ারা। সর্বদা লবন শুকনো মরিচের গুড়া থাকত আমাদের স্কুল ব্যাগের মাঝে বই খাতার ফাঁক ফোঁকরে।
যখন ইচ্ছে ছুটে যেতাম তাদের বাড়ি। কোন বাঁধা ছিল না। তার মা আমাকে নিজের ছেলের মত স্নেহ করতো, খাওয়াতো। আমার এই প্রিয় বন্ধুটির নাম সাকিব। সাকিবের বাবা ছিলেন একজন সরকারী চাকুরীজীবী। তিনি কর্মরত ছিল শিক্ষা অফিসে। চাকুরীর খ্যাতিরে তাকে সবসময় গ্রামের বাহিরে থাকতে হত। প্রতি সপ্তাহের বৃহস্পতিবারে বাড়ি আসতো এবং শনিবার সকালে এলাকা ত্যাগ করতো। পরিবারে তিন ভাই বোনের মাঝে বন্ধু ছিল সবার ছোট। তাই পরিবারে তাকে সবাই খুব স্নেহ করত। আর পরিবারের কোন দায়িত্ব তাকে পালন করতে হতো না।
শত বন্ধুত্বের মাঝেও কিন্তু আমাদের দুজনের মাঝে ছিল এক প্রকার প্রতিযোগিতা। সেটা হচ্ছে ক্লাসে রোল নাম্বার “এক” নিয়ে এই ব্যাপারে কেউ কাউকে কোন দিক থেকে সাড় দিতাম না। অবশ্য সাকিব ছিল আমার চেয়ে অনেক মেধাবী এবং উপস্থিত বুদ্ধি সম্পন্ন। তবুও সকল পরীক্ষায় তার সাথে আমার মোট নাম্বারের পার্থক্য থাকত দুই বা তিনের।
এভাবে পেরিয়ে যায় আমাদের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ক্লাসের বার্ষিক পরীক্ষা। ইতোমধ্যে বছরও প্রায় শেষ পর্যায়ে। আমাদের অপেক্ষা তখন ফলাফল পাওয়ার জন্য। বিদ্যালয় বন্ধ। তার মাঝে একদিন আমার ছোট বোন আম্মুকে জড়িয়ে ধরে বাহানা ধরে নানার বাড়ি যাওয়ার। তার বিদ্যালয়ও তখন বন্ধ। আম্মু তার বাহানায় অনেক কষ্টে আব্বুকে রাজি করে নানার বাড়ি যাওয়ার। নানার বাড়ি আমাদের বাড়ি থেকে অনেক দূর।
যদিও অনেক দিন পর আমরা নানার বাড়ি যাচ্ছি তবুও আমি রাজি ছিলাম না। কারন এই সময় গুলোতে আমি আমার বন্ধু সাকিবকে অনেক মিস করব। মিস করব সবুজ শ্যামলের মাঝে দুই বন্ধু মিলে ঘুড়ি ওড়ানো, বনে বাদাড়ে ঘোরে ফিরে পাখির বাসায় উকি মেরে তাদের বাচ্চাদের নিয়ে তাদের নরম কোমল পালকে হাত বুলিয়ে দেওয়া থেকে। মিস করব আমাদের পরিকল্পনাগুলো।
পর দিন খুব সকালে আম্মু আমাকে ঘুম থেকে টেনে তুলে বলেন “দ্রুত তৈরী হয়ে নাও আমরা কিছুক্ষনের মাঝেই রওয়ানা হব তোমার নানার রাড়ির উদ্দেশ্যে। অনেক দূরের পথতো তাই আমাদের সকালে সকালে রওয়ানা দিতে হবে।” আমি এদিক সেদিক না তাকিয়ে মুখ হাত না ধুয়ে চোখ মুছতে মুছতে দিলাম এক মহা দৌড় সাকিবদের বাড়ির দিকে তার কাছ থেকে বিদায় নিতে।
বিদায় নিয়ে আসতে সাকিবের সেকি কান্না! তার কান্নায় আমি আর নিজেকে সামলে রাখতে পারিনি। অশ্রু ভরা চোখে তার নিকট থেকে বিদায় নিয়ে এসে রওয়ানা দিই নানার বাড়ি।
বহুদিন পর নানার বাড়ি যাওয়া। সবাই আমাদের দেখে মনে হল আকাশে খচিত সুখ তারা খুঁজে পায়। নানু আম্মুকে জড়িয়ে দুজনের সে কি কান্না! অন্যরা আমাদের নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। আমাদের আগমন দেখে নানা ছুটে চলে বাজার করতে। রাতে সেকি খাওয়ার আয়োজন!
শুরু হয়ে যায় সকলের যৌথ গল্প গুজব। এভাবে কেটে যায় নানার বাড়িতে দু সপ্তাহ। এদিকে আমার চটপটানি শুরু হয়ে যায় অনেক দিন আমার বন্ধুকে না দেখতে পেরে। পরের দিন সকালে মাকে বাধ্য করি বাড়ি ফিরে যেতে।
বিকেল পাঁচটায় আমরা বাড়ি এসে পৌঁছি। বাড়ি আসতে না আসতেই আমি ছুটে যাই আমার বন্ধুর সাথে দেখা করতে। অনেক দিন পর বন্ধুর বাড়িতে আমার পদচিহ্ন। তাদের বাড়িতে পৌঁছে মনটা অন্য রকম হয়ে যায়। তাদের বাসার জিনিস পত্র সব তিন চার জন লোক প্যাকেট করছে। আর সাকিবের আব্বু আম্মু দুজনেই তাদের দেখিয়ে দিচ্ছে। কিন্তু তাদের মুখটা খুবই বিমর্ষ। সাকিব মুখ ঘোমরা করে তাদের পাশে দাঁড়িয়ে আছে। তাদের এই অবস্থা দেখে আমার মনে কৌতুহল জাগে। কিছুক্ষনের মাঝে সাকিব দ্রুত এসে আমাকে জড়িয়ে দরে কান্নায় ভেঙে পড়ে আর ঠোঁট কাপা কাপা স্বরে বলে, “আমার আব্বু এখান থেকে শহরে বদলি হয়ে গেছে। আগামী কাল সকালে আমরা সবাই শহরে চলে যাব।”
কথাটা শুনতে না শুনতেই আমি যেন আকাশ থেকে ধপ করে মাটিতে পড়ে গেলাম। ঠিক সেই সময় কেউ যেন আমার বুকের ভিতর থেকে আমার কলিজাটা মুচড়িয়ে বের করে নিয়ে আসে। আমি তাকে আরো জোরে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে শুরু করি।
সেই রাত আমি আর বাড়ি ফিরি নি। সারা রাত দুজনে মিলে বাড়ির সামনের পুকুরের ঘাঁটে গল্প গুজব আর হারানো দিনগুলোর কথা স্মরন করে একজন আরেকজনের সাথে ভাগাভাগি করে নিই। এভাবেই কেটে গেল সারা রাত।
পরদিন সকালে সব কিছু গুছিয়ে সবাই ব্যস্ত হয়ে পড়ে। ইতোমধ্যে তাদের গাড়ি এসে ভিড়ে বাড়ির ভেতর। ক্রমান্বয়ে সকল মালামাল গাড়িতে তুলে আর তারা বাড়ির সবার কাছে বিদায় নিয়ে নেয়। বিদায় নেওয়া শেষ। এখন সবাই কান্নায় জড়িয়ে পড়ে। একে অপরকে জড়িয়ে মহা কান্না! আমি কিছুতেই সাকিবকে বিদায় দিতে চাই নি। তবুও দিতে হল। যাওয়ার কালে তার স্মীতিটুকু ধরে রাখতে সে স্কুলে মেধা তালিকায় পাওয়া ক্রেস্টটা আমার হাতে তুলে দেয়।
তাদের বিদায় জানিয়ে প্রচন্ড ব্যথা, মর্মাহত হৃদয়ে আমি বাড়ি ফিরে আসি। সারাটা দিন কেটে যায় প্রবল যন্ত্রনার মাঝে। নাওয়া খাওয়া কোন কিছু ভাল লাগে না।
দিন শেষে রাত আসে। হাজার বছরের পুরোনো সেই রাত। যার প্রকৃতি সবসময় একই রকম। কিন্তু সে দিনের রাতটা ছিল কিছুটা ভিন্ন। সন্ধ্যা থেকে হুতুম পেঁছার চেঁচানি। প্রকৃতির আকাশে একটা হাহাকার। চারদিক থেকে যেন এলোমেলো বাতাস বইল আর কারো কান্নার রোল বয়ে বেড়াল; সেই সাথে প্রকৃতি আমাকে একটা সংবাদ দিয়ে গেল; কিন্তু যদিও সেটা আমি ঠিক বুঝতে পারিনি।
মনে হাহাকার! নেই চোখে ঘুম! মনে কোন শান্তি! সারাক্ষন চটপট করতে করতে চলে আসে মধ্যরাত। প্রকৃতির মধ্য থেকে কেউ যেন আমাকে সুর তুলে ডাকল এবং বলে উঠল; বন্ধু, আমি যাবো না, তোমাকে ছেড়ে। আমাকে তুমি বাঁচাও; লুকিয়ে রাখো তোমার মাঝে! তার কান্নার রোল চারদিক থেকে আমাকে গভীরভাবে জড়াচ্ছে।
সাথে সাথে আমি লাফ দিয়ে বিছানা থেকে উঠে পড়ি। জানালার পাশে বসে দৃষ্টি ফেলি দূর আকাশে। যেথায় তারা গুলো মিটমিট করে জ্বলছে আর মৃদু হেসে আলো ছড়াচ্ছে। এদের ভেতর থেকে একটা তারা অন্যদের চেয়ে সম্পূর্ন আলাদা দৃষ্টিতে আমার পানে তাকাচ্ছে আর একটু বড় হয়ে আলো চড়াচ্ছে। সাথে মৃদু হেসে আমাকে ইসারা দিয়ে কিছু বলতে চেষ্টা করছে।
মুহুর্তের মাঝে উচ্চস্বরে হাউমাউ ভেসে আসে দূর বহু দূর থেকে। গভীর রাত! নিস্তব্ধ! নীরব প্রকৃতি! কান্নার রোল কোন দিক থেকে আসছে তা ঠিক বুঝে উঠতে না উঠতেই ভয়ে আমার মুখ থেকে অকপটে বেরিয়ে আসে এক ধরনের ক্রন্দন। আমি দ্রুত ধেঁয়ে চলি আত্মনাদের দিকে; কিন্তু কোন দিক থেকে আসছে তা ঠিক বুঝে উঠতে না পেরে ডানে বামে ছোটাছোটি শুরু করি।
ক্রমান্বয়ে আত্মনাদের সুর যখন আমার খুব সন্নিকটে আসে, তখন আমি নিশ্চিত হই আমার ডান পাশ থেকে মানে বন্ধুর বাড়ির দিক থেকে সুরটা ভেসে আসছে। এদিক ওদিক না তাকিয়ে বরাবর তাদের বাড়ির দিকে ছুটে চলি। বাড়ির দরজায় গিয়ে কান্নার রোল আর মানুষের উপস্থিতি দেখে আমি রীতিমত হতবাক! কাউকে কিছু জিজ্ঞেস না করে অবাক ও হতাস হৃদয়ে সবার মুখপানে তাকাতে থাকি আর আত্মনাদের কারন অন্বেষন করতে থাকি। অবশেষে নিজেকে সামলাতে না পেরে একজনকে প্রশ্ন করি। তার কাছ থেকে এক অপ্রত্যাশীত উত্তর পেয়ে রীতিমত আমার মাথায় বাজ পড়ে! আমি তো আকাশ থেকে মাটিতে পড়ে যাই!
সাকিব সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়। তার পরিবারের অন্যান্যরাও আহত হয়।
সাকিবকে হারানোর ব্যথা অবর্ননীয়। রক্ত মিশ্রিত কোমল দেহে শুয়ে আছে মাটিতে। শরীরে পরিহীত পোশাকের অনেক অংশে রক্তের দাগ ভেসে আছে। কোমল মুখ খানি ফুটন্ত গোলাপের মত চেয়ে আছে সবার পানে। আমি নিজের চোখগুলোকে বিশ্বাস করাতে পারিনি; তবুও বাধ্য হলাম যেহেতু এটাই ছিল বাস্তবতা। আসলে প্রকৃতির নিয়ম তো কখনো অস্বীকার করা যায় না। সর্বদা তা মেনে নিতে হয়। তাই আমাকেও মেনে নিতে হল।
আমি বন্ধুকে হারিয়ে যে কি হারালাম তা শুধু বিধাতাই পর্যবেক্ষন করেছে। হয়ত বা এটাই প্রকৃতির নিয়ম, অতি পছন্দের কোন কিছু বেশি দিন থাকে না। তাই তো আমি আমার জীবনের সবচেয়ে পছন্দের বন্ধুটিকে হারিয়ে একেবারে নিঃশ্ব বনে গেলাম।
জীবন স্রোত কখনো থেমে থাকে না। এই স্রোতের গতিতে গা ভাসিয়ে আমি প্রায় পনের বছ্রর কাটালাম বন্ধু বিহীন; কিন্তু জীবনের মাঝ পথে এসেও প্রতিটি মুহুর্তেই বন্ধু হারানোর যন্ত্রনাটা আমাকে এবং আমার অন্তরটাকে খুঁড়ে খুঁড়ে খাচ্ছে। শুধু বন্ধুর সাথে মেতে থাকা মধুর দিনের স্মীতিগুলো আর শেষ বিদায়ে তার কাছ থেকে পাওয়া ক্রেস্টটা নিয়ে আজও আমি বেঁচে আছি।
প্রকৃতি আমার ছোট এই বন্ধুটিকে নিষ্ঠুরের মত তার আপন গহ্বরে লুকিয়ে রেখেছে। আমাদের দৃষ্টির আড়ালে। এই পৃথিবীর রূপ, রস, গন্ধ থেকে দূরে! বহু দূরে! আমাদের নাগালের অনেক বাহিরে। তবুও সে বেঁচে থাকবে জনম জনম ধরে কল্পনার প্রতিটি মুহুর্তে, প্রতিটি শ্বাস-প্রশ্বাসের মাঝে। সে এই প্রকৃতির মাঝে বেঁচে ছিল, বেঁচে আছে, বেঁচে থাকবে ততদিন, যতদিন প্রকৃতি তার নিজ রাজ্য পরিচালনা করবে।

মাহবুব আলম মুরাদ, ইংরেজী সাহিত্য বিভাগ, বাংলাদেশ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, মোবাঃ ০১৯১৯৮৭৯৩০৯ Mahbub_murad@yahoo.com
Comments
Write Comment
Leave your valued comment. Sign Up


TS Management System