Title: শেয়াল দেবতার প্রতিহিংসা

অ্যানুবিসের বিশাল মূর্তি দাঁড়িয়ে আছে অন্ধকারে। ওর অন্ধ চোখ শত সহস্র বছরের অসীম আঁধার সয়ে আসছে, হাজার বছরের ধুলো জমেছে পাথুরে দৃষ্টিতে। গুহার স্যাঁতসেঁতে হাওয়া বিকট মূর্তির গায়ে সৃষ্টি করেছে কালের ক্ষত, তবে পাথরের ঠোঁট দুটোর পৈশাচিক হাসির ভয়াবহতাকে ম্লান করতে পারেনি একটুও। যেন জ্যান্ত দানব একটা। কিন্তু শেয়াল দেবতা অ্যানুবিস নিস্প্রাণ একটা পাথুরে মূর্তি ছাড়া কিছুই নয়। এই দেবতার যারা পূজা করত সেই পূজারীরা মরে কবে ভূত হয়ে গেছে। এই গুহার চারপাশে যেন মৃত্যুর ছায়া, এই ছায়া যেন ঘুরে বেড়ায় অ্যানুবিসকে ঘিরে। ঘাপটি মেরে আছে মমির কফিনে, গা মিশিয়ে আছে শতাব্দী প্রাচীন মেঝের ধুলোর স্তূপে। মৃত্যু এবং অন্ধকারের এই ভয়াল রাজ্যে আলোর প্রবেশ নিষেধ। গত তিন হাজার বছরের এখানে আলোর একটি রেখাও দেখা যায়নি। কিন্তু তিন হাজার বছর পর আজ দেখা গেলো। গুহাগুলোর শেষ মাথায় ঝনঝন শব্দ শোনা গেলো, কারা যেন ত্রিশ শতকের পুরোনো লোহার গেট খুলে ফেললো। তারপর খোলা দরজা দিয়ে ভেতরে প্রতিফলিত হলো মশালের আলো, এরপর ভেসে এলো মানুষের গলা। ব্যাপারটা রোমহর্ষক এবং অদ্ভুত। গত তিন হাজার বছরে এই কালো এবং ঘুটঘুটে অন্ধকার সমাধিস্তম্ভে আলোকরেখার কোনও প্রবেশ ঘটেনি। গত তিন হাজার বছরে ধুলোয় ধূসরিত মেঝেতে পড়েনি কারও পায়ের ছাপ। গত তিন হাজার বছরে এই গুহার প্রাচীন বাতাস বয়ে আনেনি কোনও মনুষ্য কণ্ঠ। এই গুহার শেষ আলোকরেখা বিচ্ছুরিত হয়েছিলো বাস্ত-এর সন্ন্যাসীর হাতের মশাল থেকে; ধুলোয় শেষ পায়ের ছাপ পড়েছিলো মিসরীয়দের; শেষ কণ্ঠটি শোনা গিয়েছিলো নীলনদের এক পূজারীর। কিন্তু আজ, হঠাৎই গুহামুখ আলোকিত হয়ে উঠেছে বৈদ্যুতিক মশালের আলোয়, মেঝেয় বুট জুতোর শব্দ আর বাতাসে পুরুষালি ইংরেজ কণ্ঠ।
মশালের আলোয় মশালবাহীর চেহারা দেখা গেলো। মানুষটি লম্বা, রোগা। বাঁ হাতে ধরা পার্চমেন্ট কাগজের মতোই তাঁর চেহারায় বয়সের রেখা সুস্পষ্ট। ভদ্রলোকের মাথার চুল যেন কাশফুল, কোটরাগত চোখ আর হলদেটে ত্বক তাঁকে বুড়ো মানুষের কাতারে ফেললেও ঠোঁটে ঝুলে থাকা হাসিতে মালিন্য নেই একবিন্দু, যুবকের আত্মপ্রত্যয় এবং দৃঢ়সংকল্প যেন ধারণ করে আছে ওই হাসি। তাঁর ঠিক পেছনেই এক তরুণ, হুবহু বৃদ্ধের চেহারা। বোঝাই যায় যুবক বৃদ্ধের সন্তান।
‘আমরা তা হলে ঠিক জায়গায় এসে পড়েছি!’ উত্তেজিত হয়ে বলল তরুণ।
‘হ্যাঁ, খোকা, এসেছি।’ হাসিমুখে জবাব দিলেন বাবা।
‘বাবা, দেখো! ওই যে সেই পাথরের মূর্তি। ম্যাপে যেটার নাম লেখা ছিলো!’
মেঝেতে হালকা পায়ে দুজনে আগে বাড়লেন, মূর্তিটির সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। স্যার রোনাল্ড বার্টন হাতের মশালটা উঁচিয়ে ধরলেন শেয়াল দেবতাকে ভালো করে দেখার জন্য। পিটার বার্টন তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে চোখ তুলে চাইলো কদাকার চেহারাটার দিকে।

অনেকক্ষণ ধরে দুজনে খুঁটিয়ে দেখলেন বিশাল মূর্তিটিকে। দরজা দিয়ে আসা দমকা হাওয়া অ্যানুবিসের গা থেকে অনেকটা ধুলো উড়িয়ে নিয়ে গিয়েছে। মশালের আলোয় চকচক করছে ওটার গা। বারো ফুট লম্বা, মানুষ আকৃতির কুকুরমুখো ওই শেয়াল দেবতার গোটা অস্তিত্বে অশুভ কী যেন একটা আছে। মূর্তিটার লম্বা হাত দুটো অভিশাপ দেয়ার ভঙ্গিতে উঁচিতে আছে, যেন কেউ তার শান্তিভঙ্গ করতে এলে লাফ দিয়ে বহিরাগতকে ধ্বংস করে ফেলবে। দানব মূর্তির পেছনে উঁকি দিলেন স্যার রোনাল্ড বার্টন। খালি একটা কুলুঙ্গি ছাড়া কিছু নেই ওখানে।
মূর্তির হাসিটা দারুণ জীবন্ত মনে হলো, পাথুরে চোখ দুটো যেন সতর্ক করে দিচ্ছে, সাবধান। কাছে এসো না।

দুজনের কেউ কথা বলছেন না, তবে দুজনেরই কেমন অস্বস্তি হচ্ছে, গুমট, দমবন্ধ করা অবস্থা, আলো-ছায়ার এই গুহায় কীসের যেন অশুভ সঙ্কেত, বুকে কাঁপন ধরিয়ে দেয়। শেষ পর্যন্ত নীরবতা ভাঙলেন স্যার বার্টন নিজেই। ‘ঠিক আছে, খোকা। সারাদিন এটার দিকে তাকিয়ে থাকলে কোনোও ফায়দা হবে না। আমাদের এখন অনেক কাজ বাকি। ম্যাপটা একবার দেখে নিয়েছিস তো?’
‘দেখেছি, বাবা,’ মৃদু গলায় জবাব দিল ছেলে। বাপের মতো গমগমে কণ্ঠ নয়। এখানকার বাতাসে দম নিতে তার কষ্ট হচ্ছে। কেমন নর্দমার গ্যাসের গন্ধ। তবে পুঁতি গন্ধটাকে সে সহ্য করে থাকল। কারণ পিটার জানে সে তার বাবার সঙ্গে একটি গোপন সমাধিস্তম্ভে প্রবেশ করেছে, মাটি থেকে সাতাশ ফুট নিচে। ত্রিশ শতাব্দীর প্রাচীন এক সমাধিস্তম্ভে। সমাধি আবিষ্কারের আনন্দও কিছুতেই মাথা থেকে অভিশাপের কথাটা বিস্মৃত হতে দিতে চাইছে না।

এই জায়গার ওপর একটি অভিশাপ রয়েছে; আর সেটি জানার জন্যই মূলত এখানে আসা। স্যার রোনাল্ড প্যাপিরাস পার্চমেন্ট ম্যাপটির সন্ধান পেয়েছেন নিনথ পিরামিড খুঁড়তে গিয়ে। কী করে তিনি অভিযানকারী দলের অন্যান্যদের ফাঁকি দিয়ে কাগজখানা হাতড়িয়েছেন কেউ জানে না। কিন্তু যে ভাবেই হোক কাজটা করেছেন তিনি।

অবশ্য মানচিত্র চুরি করার জন্য তাঁকে খুব বেশি দোষ দেয়া যায় না। কারণ গত বিশ বছরে স্যার রোনাল্ড বার্টন অসংখ্য মরুভূমি চুল আঁচড়ানোর মত আঁচড়েছেন, আবিষ্কার করেছেন বহু পবিত্র ধ্বংসাবশেষ, মর্মোদ্ধার করেছেন কঠিন এবং দুর্বোধ্য সব চিত্রলিপির, কবর খুঁড়ে তুলেছেন কত মমি, স্ট্যাচু, প্রাচীন আসবাবপত্র, মূল্যবান পাথর। কিন্তু তাতে কী লাভটাই বা হয়েছে? যে সরকারের জন্য, দেশের জন্য, পুরাতত্ত্বের সমৃদ্ধির জন্য এত পরিশ্রম করেছেন তিনি, রক্ত পানি হয়ে গেছে খাটতে খাটতে, সেই দেশ কিংবা সরকার তো তাঁকে কিছু দেয়নি। অন্তত পুরাতত্ত্ব বিভাগের প্রধানের আসনে অধিষ্ঠিত করার সম্মানটুকু পর্যন্ত দেখায়নি। তা হলে, শেষ বয়সে খ্যাতি এবং অর্থপ্রাপ্তির আশায় তিনি যদি একটু এদিক-সেদিক করেনই, তা হলে কি তাঁর খুব বেশি নিন্দা করা যায়?

তা ছাড়া মিসরের প্রায় সব পুরাতত্ত্ব বিজ্ঞানীরই মাথায় কমবেশি একটু ছিট আছে। অবশ্য দিনের পর দিন চাঁদি ফাটানো, মগজ গলিয়ে দেয়া রোদ্দুরে দাঁড়িয়ে উত্তপ্ত বালু খননের মতো বিরক্তিকর এবং একঘেয়ে কাজ আর নেই। মস্তিষ্ক রীতিমত বিদ্রোহ করে। আর মাটির নিচের ড্যাম্প পড়া নিকষ কালো কবরগুলোর ভৌতিক আবহ শুকিয়ে দেয় আত্মা। প্রাচীন, ভয়ঙ্কর চেহারার দেবতাদের দিকে তাকানোর ব্যাপারটিও খুব একটা সুখকর নয়, বিশেষ করে বেড়াল মাথার বুবাসিস্ট, নাগ দেবতা সেট এবং সাক্ষাৎ শয়তান আমন-রা পিরামিডের সামনে যেভাবে অতন্দ্র প্রহরীর মত দাঁড়িয়ে থাকে, তাতে এদেরকে অগ্রাহ্য করে ভেতরে প্রবেশ করার কথা ভাবতে অতি সাহসী লোকেও বুক কাঁপে। নিষিদ্ধ এই এলাকার বাতাসে মৃত্যুর গন্ধ রক্তে যেন শিহরণ জাগায়, শিরায় শিরায় হেঁটে বেড়ায় কিলবিলে পোকার মতো। স্যার রোনাল্ড শখের বশে কিছুদিন প্রেততত্ত্ব নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করেছেন। সম্ভবত এ কারণে ভৌতিক ব্যাপারগুলোর প্রতি অন্যদের চেয়ে তাঁর আকর্ষণ একটু বেশিই। তাই পার্চমেন্টের ম্যাপটা চুরি করতে তিনি দ্বিধা করেননি, যে কোনও মূল্যে এটা যোগাড়ে তিনি ছিলেন দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।

এই ম্যাপটি প্রাচীন মিসরের এক সন্ন্যাসীর দখলে ছিলো। কিন্তু সন্ন্যাসী মোটেও ভাল লোক ছিলেন না। তিনি প্রেততত্তে¡র ওপর একটি পাণ্ডুলিপি রচনা করেছিলেন। সন্ন্যাসী, বলাবাহুল্য ছিলেন প্রেতপূজারী। স্যার রোনাল্ড এই পাণ্ডুলিপি খুঁজে পান সন্ন্যাসীর মমির সঙ্গে। তবে লেখাটি তিনি নষ্ট করেননি। ভয় ছিলো যদি অভিশাপ নেমে আসে। স্যার রোনাল্ডের ধারণা যে কোনোও কারণেই হোক সন্ন্যাসীর ওপর প্রেত দেবতাদের অভিশাপ নেমে এসেছিলো। কারণ মমি করা সন্ন্যাসীর হাত, পা, চোখ কিছুই অবশিষ্ট ছিলো না। যেন নিষ্ঠুর আক্রোশে কেউ হাত আর পা ছিঁড়ে নিয়েছে, উপড়ে ফেলেছে চোখ। তবে এতদিন পরেও ছিন্নভিন্ন লাশে পচন ধরেনি। পশুচামড়ায় লেখা ছিলো পাণ্ডুলিপি। প্রাচীন মিসরীয় ভাষা জানেন বলে লেখাটি পড়তে অসুবিধে হয়নি স্যার বার্টনের। যতই পড়েছেন ততই বিস্মিত হয়েছেন, আগ্রহ বেড়েছে পরের পৃষ্ঠাগুলো পড়ার জন্যে। পড়তে পড়তে জানতে পারেন অন্ধকার রাজ্যের এক পিশাচ দেবতার কবরের কথা। এই দেবতা অশুভ আর ধ্বংসের প্রতীক, আলোর ঘোরতর শত্রু, আঁধারই তার চালিকাশক্তি। পাণ্ডুলিপির মধ্যে স্যার রোনাল্ড একটি ম্যাপ, একটি চার্ট এবং পিশাচ দেবতার গুহায় পৌঁছার সমস্ত নির্দেশনাও পেয়ে যান।

পিটার বার্টনের মনে আছে সেই রাতের কথা যে রাতে বাবা দুর্বোধ্য ওই পাণ্ডুলিপি ইংরেজিতে অনুবাদ করে ওকে পড়িয়ে শুনিয়েছিলেন। মনে পড়ে বাবার চোখ কী রকম ঝিকমিক করছিলো, যেন বুকের ভেতর থেকে উঠে আসছিলো কথাগুলো।
‘এবং মানচিত্রের নির্দেশানুযায়ী তুমি দেখতে পাবে সমাধির প্রভুকে যিনি তাঁর উপাসক এবং ধনরত্ন নিয়ে চিরনিদ্রায় শুয়ে আছেন।’
শেষ শব্দটা উচ্চারণ করার সময় উত্তেজনায় স্যার রোনাল্ডের কণ্ঠ যেন বসে গিয়েছিলো।

‘এবং প্রবেশের রাতে তোমাকে অবশ্যই শেয়াল দেবতার উদ্দেশে তিনটে শেয়ালকে উৎসর্গ করতে হবে এবং তাজা রক্ত খেতে দিতে হবে শুষ্ক বালুকে। তারপর নেমে আসবে অসংখ্য ক্ষুধার্ত বাদুড়, এরা শেয়ালগুলোকে ভক্ষণ করবে এবং রক্ত নিয়ে চলে যাবে অন্ধকার জগতে পিতা সেট-এর উদ্দেশ্যে।’
‘এ স্রেফ কুসংস্কার,’ বলেছিলো পিটার।
‘বাজে কথা বলিস না,’ পিটারকে ভর্ৎসনা করেছিলেন স্যার রোনাল্ড। ‘এই রচনার প্রতিটি জিনিস আমি তোকে ব্যাখ্যা করতে পারি, বোঝাতে পারি। কিন্তু তাতে তোর ক্ষতি ছাড়া লাভ হবে না।’ পিটার আর কিছু না বলে শুনে গেছে।

‘বাইরের চত্বরে আসার পর তুমি দরজাটা দেখতে পাবে, দরজার গায়ে প্রভুর চিত্রাঙ্কিত প্রতীক। প্রতীকটির সপ্তম মস্তকের সপ্তম জিভটি ছুরি দিয়ে খুঁটিয়ে দরজা থেকে ছুটিয়ে আনবে। তারপর খুলে যাবে দরজা এবং সমাধি কক্ষে ঢোকার অধিকার একমাত্র হবে তোমারই। ভেতরের চত্বরে যেতে তোমাকে গুনে গুনে তেত্রিশবার পা ফেলতে হবে, তারপরই তুমি সোজা গিয়ে উপস্থিত হবে অ্যানুবিসের মূর্তির সামনে। যার আরেক নাম পথপ্রদর্শক।
‘অ্যানুবিস! এটা মিসরীয়দের এক দেবতার নাম না?’ অবাক হয়ে জানতে চেয়েছে পিটার।
তারপর বাবা পাণ্ডুলিপি দেখে ছেলের প্রশ্নের জবাব দিয়েছেন।
‘প্রভু অ্যানুবিস-এর হাতে আছে জীবন এবং মৃত্যুর চাবিকাঠি, তিনি গুপ্ত কার্নেটারকে পাহারা দেন এবং কেউ তাঁর অনুমতি ছাড়া অবগুণ্ঠন উত্তোলন করতে পারে না। এই শেয়াল দেবতাকে যদি কেউ বন্ধু ভেবে থাকে তা হলে সে মহা ভুল করবে। কারণ তিনি বন্ধু নন। অ্যানুবিস ছায়ার দেবতা, আর এ জন্যেই তিনি সকল রহস্য গোপন রাখেন। বহু আগে, যে দিনের হিসেব কেউ জানে না, সেই সময় প্রভু অ্যানুবিস মানুষের সামনে প্রথমবারের মত উপস্থিত হয়েছিলেন। দেবতাদের মধ্যে তিনিই প্রথম এক বিশেষ চেহারায়, তাঁর প্রকৃত রূপে হাজির হন। তাঁর সেই বিশেষ চেহারা তুমি দেখতে পাবে ভেতরের বারান্দার শেষ মাথায়। দেখতে পাবে পথপ্রদর্শক-এর আসল চেহারা।’
‘সাংঘাতিক ব্যাপার তো!’ বিড়বিড় করে বলেছে পিটার। ‘ব্যাপারটা সত্যি হলে কী অবস্থা হবে চিন্তা করো একবার? শেয়াল দেবতার বিকট চেহারার আসল রূপ সামনাসামনি দেখার কথা ভাবা যায়!’

স্যার রোনাল্ড হেসেছেন শুধু, কোনও মন্তব্য করেননি। আবার পড়ায় মনোনিবেশ করেছেন তিনি।
‘দেবতার প্রথমদিকের চেহারা বাকিগুলো থেকে ভিন্ন বর্ণনা করেছে পাণ্ডুলিপি। ‘তবে এই চেহারা দেখা সাধারণ মানুষের জন্যে মঙ্গলজনক নয়, তাই পূজারী প্রভুরা যুগ যুগ ধরে তাঁর প্রকৃত চেহারা লুকিয়ে রেখেছেন এবং তাঁর প্রয়োজন অনুসারে তাঁর পূজা করেছেন। কিন্তু এখন আমাদের শত্রæরা (ওদের আত্মা পুড়ে মরুক, পচন ধরুক শরীরে।) ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানকে অবজ্ঞা করার সাহস দেখালে প্রভু তাঁর প্রতিবিম্ব লুকিয়ে রাখার সিদ্ধান্ত নেন এবং তাঁর মৃত্যুর সঙ্গে তাঁর প্রতিবিম্বকেও কবর দেয়া হয়।’

শেষের লাইনগুলো স্যার রোনাল্ড আরও দ্রুত পড়ে গেছেন, বার বার কেঁপে উঠেছে তাঁর কণ্ঠ : ‘কিন্তু গুহার শেষ মাথায় অ্যানুবিস শুধু এই কারণে একা দাঁড়িয়ে নেই। তিনি আক্ষরিক অর্থেই পথপ্রদর্শক এবং তাঁর সাহায্য ছাড়া কেউ সমাধির ভেতরে প্রবেশ করতে পারবে না।’
এই পর্যন্ত পড়ে অনেকক্ষণ চুপচাপ থেকেছেন বুড়োমানুষটি।
‘কী হলো?’ অধৈর্য পিটার জানতে চেয়েছে। ‘আমার ধারণা এই শেয়াল দেবতাকে নিয়েও অনেক আজগুবি পূজা-অর্চনার কথা আছে, তাই না?’
স্যার রোনাল্ড জবাব দেননি, নীরবে কী যেন ভাবছিলেন। পিটার লক্ষ্য করেছে পার্চমেন্ট ধরা বাবার হাত দুটো কাঁপছে। যখন চোখ তুলে চেয়েছেন, ভয়ানক বিমর্ষ লাগছিলো তাঁকে। ‘হ্যাঁ, খোকা’-ঘড়ঘড়ে গলায় জবাব দিয়েছেন তিনি। ‘ঠিক তাই-আরেক অনুষ্ঠানের কথা বলা আছে ওখানে। কিন্তু ওখানে যাওয়ার আগে এ নিয়ে মাথা না ঘামালেও চলবে।’
‘তার মানে তুমি ওখানে যাবে-জায়গাটা খুঁজে দেখবে?’ উৎসুক হয়ে শুধিয়েছে ছেলে। ‘অবশ্যই যাবো,’ যেন জোর করে কথাটা বলানো হয়েছিলো তাঁকে। পার্চমেন্টের শেষ ভাগে আবার নজর ফিরিয়ে নিয়েছেন তিনি :
‘কিন্তু সাবধান, অবিশ্বাসীরা কিন্তু এখানে প্রবেশ করলেই মরবে। প্রভু অ্যানুবিসকে পাশ কাটিয়ে সামনে এগুনো হয়তো সম্ভব হবে, তবে তিনি অনুপ্রবেশকারীকে বাইরের পৃথিবীতে ফেরত যেতে দেবেন না। মনে রেখো অ্যানুবিস এক অদ্ভুত দেবতা যার মধ্যে রয়েছে এক গোপন আত্মা।’

স্যার রোনাল্ড এই ক’টা লাইন অস্ফুটে খুব দ্রুত পড়ে কাগজটা ভাঁজ করে ফেলেছেন। কিছুক্ষণ পর তিনি আলোচনার মোড় ভিন্ন প্রসঙ্গে ঘুরিয়ে নেন। যেন এই ব্যাপারটাকে ভুলে থাকতে চাইছেন।

পরের সপ্তাহ বাপ-ছেলের কেটে যায় দক্ষিণে অভিযানের জন্য যোগাড়যন্ত্রে। পিটার অবাক হয়ে লক্ষ করে বাবা যেন তাকে কেমন এড়িয়ে চলছেন, একান্ত প্রয়োজন না হলে কথা বলেন না। শুধু ভ্রমণ বিষয়ক আলোচনা হলে দুজনের কথা হয়। কিন্তু পিটার কিছুই ভোলেনি। তার প্রশ্ন বাবা নীরবে সেদিন কী পড়ছিলেন। কেন তাঁর হাত কাঁপছিলো, কেনই বা হঠাৎ অন্য প্রসঙ্গে তিনি চলে গিয়েছিলেন। আর পার্চমেন্টটা নিয়ে এত ঢাক ঢাক গুড় গুড় কেন? পাণ্ডুলিপির শেষে যে অভিশাপের কথা বলা হয়েছে আসলে সেটা কী?
পিটারের মাথায় প্রশ্নগুলো কদিন বেশ কুট কুট করে কামড়ালেও ধীরে ধীরে এটার কথা ভুলে যায় সে, অনেকটাই দূর হয় ভয়। ভ্রমণের জন্য দুজনের ব্যস্ততা এত বেড়ে যায় যে অন্য কিছু নিয়ে চিন্তা করার সময় তাদের ছিল না। আসল জায়গায় পৌঁছার পর এলাকাটার নির্জনতা চারদিক থেকে চেপে বসে পিটারকে। আবার ফিরে আসে সেই ভয় এবং দুশ্চিন্তা। স্যার রোনাল্ড একবার তাকে মিসরীয়দের প্রেততত্ত্বের ওপর কিছু কথা বলেছিলেন, প্রধান ধর্মযাজকদের অনেক আশ্চর্য গল্প শুনেছে সে তার বাবার কাছে। এটা তাদের সেই জন্মস্থান। পিটারের দু একজন বন্ধুর সবাই অভিশাপের ব্যাপারটি বিশ্বাস করতো। এদের প্রত্যেকের মৃত্যু ঘটেছে অদ্ভুতভাবে। এ ছাড়াও রয়েছে তুতানখামেন এবং পট মন্দিরের রোমহর্ষক ঘটনা। গভীর রাতে, তারা জ্বলা আকাশের দিকে তাকিয়ে থেকে এ সব গল্প মনে করতো। সামনে তার জন্য না জানি কী বিপদ ওত পেতে আছে ভেবে শিউরে উঠতো। তারপর, মানচিত্রে চিহ্নিত নির্দিষ্ট জায়গায় স্যার রোনাল্ড তাঁবু বসালে নতুন আরেক অশুভ সঙ্কেতের সূচনা হয়।

আস্তানা গাড়ার প্রথম রাতেই স্যার রোনাল্ডকে তাঁবুর পেছনের দিকের পাহাড়ে একা যেতে দেখে কৌতূহলী হয়ে ওঠে পিটার। বাবার হাতে রশি বাঁধা একটি সাদা ছাগল এবং মস্ত ধারাল ছুরি দেখে সন্দেহ আরও বেড়ে যায় তার। পিছু নেয় সে। তারপর ঘটে সেই ঘটনা। ছাগলটি জবাই করেন স্যার রোনাল্ড। অবোধ পশুটার ফিনকি ছোটা রক্ত মুহূর্তে শুষে নেয় শুকনো বালু। বাবার চোখে তখন কসাইদের উৎকট উল্লাস।

একটি ঢিবির আড়ালে লুকিয়ে থেকে পিটার শোনে বাবা দুর্বোধ্য উচ্চারণে মিসরীয় স্তোত্র আউড়ে চলেছেন। পিটার ভয় পাচ্ছিলো ভেবে বাবা তার উপস্থিতির কথা জেনে গেলে হয়তো আর তাকে সঙ্গে নিতে রাজি হবেন না। তবে বাবার আচরণে কেমন ক্ষ্যাপামো একটা ভাব তাকে অস্বস্তিতে ফেলে দেয়।

কিন্তু বাবার কাছে বলি বলি করেও সে জিজ্ঞেস করতে পারছিলো না। পার্চমেন্টের সেই রহস্য নয়, গোপন ‘অভিশাপ’ নিয়ে।

মাঝরাতের ওই ঘটনার পর দিন স্যার রোনাল্ড চার্ট দেখে বলেন এখন খনন শুরু করা চলে। ম্যাপে চোখ রেখে, বালিতে প্রতিটি পা মেপে তিনি তাঁর লোকদের কাজ চালিয়ে যেতে বলেছেন। সন্ধ্যার দিকে দশ ফুট ব্যাসার্ধের বিরাট একটি গর্ত খোঁড়ার কাজ শেষ হয়ে যায়, যেন হাঁ করে আছে কোনও দানব মুখ। খনন পর্ব শেষ হতেই স্থানীয় শ্রমিকরা উল্লসিত চিৎকার দিয়ে জানায় গর্তের নিচে একটি দরজা দেখতে পেয়েছে তারা।
দুই

টেনশনের চোটে পিটারের অবস্থা কাহিল। বাবা ওকে নিচে নামতে বলেছেন। সামনে ভীষণ বিপদ, ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় বলে দিচ্ছে পিটারকে। কিন্তু বাবাকে যেতে নিষেধ করার সাহস তার নেই। যাবো না কথাটি উচ্চারণ করতে পারেনি সে। কারণ তার ভয় এতে প্রচণ্ড রেগে গিয়ে স্যার রোনাল্ড কোনও অঘটন ঘটিয়ে ফেলতে পারেন। বিশ্রী, পেট গুলিয়ে ওঠা গর্তটার মধ্যে প্রবল অনিচ্ছা সত্ত্বেও বাবার সঙ্গে নেমে পড়ে পিটার।

পাণ্ডুলিপিতে বর্ণিত দরজাই ছিলো ওটা। দরজার গায়ে, ঠিক মাঝখানে মিসরীয়দের সাত প্রধান দেবতার মাথার ছবি-অসিরিস, ইসিস, রা, বাস্ত, থথ, সেট এবং অ্যানুবিস। তবে সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ব্যাপার সাতটা মাথার অধিকারী সাতজন নয়, একজন। আর ওটা কোনোও মানুষের শরীরও ছিলো না, ভয়াবহ এই আকৃতির সঙ্গে তুলনা করার মতো উপমা বোধহয় মিসরীয় কোনও বইতেও নেই। অন্তত ওই মুহূর্তে পিটারের কিছু মনে পড়েনি।

সাত মাথার ভয়াল ভয়ঙ্কর জিনিসটা দেখামাত্র ভয়ে প্রায় জমে যাচ্ছিলো পিটার, আতঙ্কের অক্টোপাস যেন চারপাশ থেকে ওকে তড়িৎ গতিতে চেপে ধরেছিলো। সাত মাথার নিচের অংশটার যেন দ্রুত রূপান্তর ঘটছিলো; মনে হচ্ছিলো গলে যাচ্ছে। অবিশ্বাস্য এবং অদ্ভুত সব আকার ধারণ করছিলো ওটা। কখনও ওটাকে মনে হয়েছে সর্পিণী মায়াবিনী মেডুসা, কখনও বিশার, বিকট ফুলের চেহারা ধারণ করেছে, ছড়িয়ে দিয়েছে বিরাট পাতা, যেন রক্ত-তৃষ্ণায় বাতাসে দুলছিলো। তারপরই চোখের পলকে ওটা পরিণত হয়েছে একদলা চকচকে রুপালি খুলিতে। আবার পরক্ষণে রুপালি খুলির রূপান্তর ঘটেছে নিখিল বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে, অজস্র তারকা আর গ্রহসহ।

এ যেন এক দুঃস্বপ্ন। কোনও শিল্পীর পক্ষে এমন বীভৎস ছবি আঁকা সম্ভব নয়। একমাত্র শয়তানের পক্ষেই এ কাজ সম্ভব। সাত মাথার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে প্রায় সম্মোহিত হয়ে পড়েছিলো পিটার। বাস্তবে ফিরে আসে বাবার ডাক শুনে। স্যার রোলান্ড সকালবেলাতেও কাঠখোট্টা ব্যবহার করলেও এখন তাঁর চেহারা আমূল বদলে গেছে। রীতিমত উৎসুক গলায় তিনি ঘোষণা করেন। ‘এটাই সেই দরজা। এই দরজার কথাই পার্চমেন্টে লেখা আছে। এখন বুঝতে পারছি প্রিন তাঁর শয়তানের পূজা অধ্যায়ে কিসের কথা বলতে চেয়েছেন। ওই অংশে তিনি দরজায় প্রতীকের কথা উল্লেখ করেছেন। যাকগে, কাজ শেষ হবার পর আমরা এটার কয়েকটা ছবি তুলব। আশা করি ছবি নিয়ে নিরাপদেই ফিরতে পারব। স্থানীয়রা কোনও ঝামেলা করবে না।’

স্যার রোনাল্ডের কণ্ঠে খুব বেশি উৎসাহের সুর। ব্যাপারটা ভাল লাগলো না পিটারের, বরং ভয় হলো। হঠাৎ মনে হলো সে তার বাবাকে খুব কম চেনে। বাপের সাম্প্রতিক গোপন কর্মকাণ্ড সম্পর্কেও সে কত কম জানে।
গতরাতেও সে তার বাবাকে দেখেছে একটা সমাধি থেকে বেরিয়ে আসতে, হাতে মরা বাদুড়। বাবাকে পাগল সন্ন্যাসীদের মত মনে হচ্ছিলো। বাবা কি সত্যি এসব ছাইপাঁশ বিশ্বাস করেন!
‘এখন!’ বিজয় উল্লাস বৃদ্ধের কণ্ঠে। ‘ছুরিটা নিয়েছি। পিছনে যাও।’
ভীত, বিস্মিত চোখে পিটার দেখলো বাবা ছুরির ডগাটা সপ্তম মাথা অর্থাৎ অ্যানুবিসের নিচে গাঁথলেন। খরখর শব্দ হলো, তারপর কুকুরমুখো মাথাটা ধীরে ঘুর যেতে লাগল যেন গোপন কোনও হাতলের সাহায্যে। ঝনঝন শব্দে খুলে গেলো দরজা, প্রতিধ্বনিটা অনেকক্ষণ রইলো।

একটা তীব্র, ঝাঁঝালো গন্ধ নাকে বাড়ি খেলো। গন্ধটা নাক সয়ে এলে স্যার রোনাল্ড দ্রুত পা রাখলেন ভেতরে। সঙ্গে পিটার। পাণ্ডুলিপির নির্দেশ অনুযায়ী গুনে গুনে তেত্রিশ পা এগোলেন। তারপর মুখোমুখি হলেন অ্যানুবিসের।
মশালের আলোয়, পিটারের মনে হলো...মূর্তিটার গায়ের রং পাল্টে যাচ্ছে। ঠোঁটের হাসিটা হঠাৎই যেন অদৃশ্য হয়ে গেলো, কঠিন হয়ে উঠলো চেহারা, দুই ঠোঁট ফুটলো প্রবল নিষ্ঠুর ভাব। হাঁ করে অ্যানুবিসের এই পরিবর্তন দেখছে পিটার, চমক ভাঙলো স্যার রোনাল্ডের ডাকে।

‘শোন, খোকা, সেদিন রাতে পার্চমেন্টের সমস্ত কথা তোকে বলিনি। তোর নিশ্চয়ই মনে আছে একটা অংশ আমি মনে মনে পড়েছিলাম। হ্যাঁ, ওই অংশটা। তোকে জানতে না দেয়ার পেছনে অবশ্যই কারণ ছিলো। কারণ পুরোটা জানলে তুই হয়তো ভুল বুঝে এখানে আসতে চাইতি না। তাই সব কথা বলার ঝুঁকিটা ও সময় নিতে চাইনি।

‘তুই জানিস না, পিটার, এই মুহূর্তটি আমার কাছে কতখানি গুরুত্বপূর্ণ। বহু বছর আমি এমন সব গোপন বিষয় নিয়ে পড়াশোনা করেছি যা অন্যের কাছে স্রেফ আজগুবি কুসংস্কারাচ্ছন্ন ব্যাপার ছাড়া অন্য কিছু নয়। কিন্তু আমি এসব বিশ্বাস করতাম। প্রতিটি বিস্মৃত কর্মের পেছনে একটি নগ্ন সত্য থাকে; বিকৃত ঘটনাও বৈধতা পেয়ে বাস্তবতায় নতুন ধারণা সৃষ্টি করতে পারে। আর এ ধরনের কোনও ঘটনার সন্ধানে আমি বহুদিন নিরলস কাজ করেছি-বিশ্বাস করতাম এরকম কোনোও সমাধি যদি আবিষ্কার করতে পারি তা হলে গোটা বিশ্বকে প্রমাণ এবং যুক্তি দিয়ে বোঝাতে সমর্থ হব। এই মূর্তির মধ্যে সম্ভবত গোপন প্রেতপূজারীদের মমি রয়েছে। তবে তার জন্য আমি আসিনি। আমি এসেছি তাদের জ্ঞানের সন্ধানে। যে জ্ঞান তাদের সঙ্গে একই সময় কবর দেয়া হয়। এসেছি সেই প্যাপিরাসের পাণ্ডুলিপির খোঁজে যাতে আছে নিষিদ্ধ গোপন সব তথ্য-জ্ঞান, যার কথা পৃথিবীর মানুষ কখনও জানার সুযোগ পায়নি। জ্ঞান-এবং ক্ষমতা!
‘ক্ষমতা! আমি ব্ল্যাক টেম্পলের কথা পড়েছি, পড়েছি সেই গভীর ধর্মবিশ্বাসের কথা যে ধর্মকে পরিচালনা করতেন পার্চমেন্টে উল্লিখিত প্রভুরা। তাঁরা জাদুটোনা করার মতো সাধারণ সন্ন্যাসী ছিলেন না; তাঁরা এ ভূলোক ছেড়েও দ্যুলোকে বিচরণ করতেন। তাঁদের অভিশাপকে সবাই ভয় পেতো, আশীর্বাদকে করতো সম্মান। কেন? কারণ তাঁদের জ্ঞানভাণ্ডার অসীম ছিলো বলে। বিশ্বাস কর পিটার, এই সমাধির মধ্যে আমরা যে গোপন তথ্যের খোঁজ পাব তা দিয়ে অর্ধেক পৃথিবীতে রাজত্ব করতে পারবো। মৃত্যু-রশ্মি, তীব্র বিষ, প্রাচীন গ্রন্থ আর জাদুবিদ্যার সম্মিলিত শক্তি দিয়ে আবার অন্ধযুগের দেবতাদের পুনর্জন্ম ঘটাতে পারবো। ভাব একবার ব্যাপারটা। এই ক্ষমতার অধিকারী যে কেউ গোটা দেশকে হাতের মুঠোয় পুরে রাখতে পারবে, পারবে শাসন করতে এবং তার শত্রুদের ধ্বংস করতেও সে এ জ্ঞান ব্যবহার করবে। তার থাকবে অজস্র ধনরত্ন, সম্পদের পাহাড়, বিলাস বৈভব, হাজার সিংহাসনের বিপুল সমারোহ!’

বাবা নির্ঘাত পাগল হয়ে গেছে, ভাবলো পিটার। ঝেড়ে দৌড় দেয়ার ইচ্ছে হলো। এই ভয়াল অন্ধকার জগৎ থেকে বেরিয়ে সুনীল আকাশ দেখার প্রচণ্ড তৃষ্ণা অনুভব করলো সে, খাঁটি, তাজা হাওয়ায় বুক ভরে শ্বাস নেয়ার আকাক্সক্ষায় আই ঢাই শুরু করল ফুসফুস। এই মৃত-শতাব্দীর ধুলাবালির কবল থেকে মুক্তি চায় সে। দৌড় দিয়েও ছিলো পিটার, কিন্তু স্যার রোনাল্ড খপ করে ওর কাঁধ চেপে ধরলেন, টান দিয়ে ওকে ঘোরালেন তাঁর দিকে।
‘তুই দেখছি আমার কথা কিছুই বুঝতে পারিসনি।’ বললেন তিনি। ‘ঘটে হলুদ পদার্থ থাকলে অবশ্যই বুঝতি। যাকগে, তাতে কিছু যায় আসে না। আমি আমার মিশন সম্পর্কে নিশ্চিত। তুইও হবি। তবে আগে আমাকে প্রয়োজনীয় কাজগুলো সেরে ফেলতে হবে। এখন তোকে পার্চমেন্টের সেই অংশটা, যেটা আমি পড়ে শোনাইনি, তাতে কী লেখা ছিলো, বলব।’ পিটারের মস্তিষ্কে যেন সতর্ক ঘণ্টি বেজে উঠল। কে যেন বলতে লাগলো পালাও-পালাও! কিন্তু স্যার রোনাল্ড ওকে শক্ত মুঠোয় চেপে ধরে আছেন। পালাবার উপায় নেই। তাঁর গলা কাঁপছে।

‘যে অংশের কথা আমি বলছি তাতে লেখা ছিলো কীভাবে এই মূর্তি পার হয়ে সমাধিতে ঢুকতে হবে। মূর্তির দিকে চেয়ে থেকে লাভ নেই, নতুন কিছু আবিষ্কার হবে না; আর এর মধ্যে গোপনীয়তা বলেও কিছু নেই, দেবতার এই শরীরে কোনও যন্ত্রাংশও নেই। মহাপ্রভু এবং তাঁর উপাসকরা এসব কাঁচা কাজ করতে যাননি। সমাধিতে ঢোকার রাস্তা একটাই-দেবতার শরীরের মধ্য দিয়ে প্রবেশ করতে হবে।’ অ্যানুবিসের মুখোশের মত ভয়ঙ্করদর্শন চেহারাটার দিকে আবার তাকাল পিটার। শেয়াল মুখটাতে ধূর্ততার ছাপ সুস্পষ্ট নাকি এ স্রেফ আলোছায়ার খেলা?
‘কথাটা অদ্ভুত শোনালেও সত্যি।’ বলে চলেছেন স্যার রোনাল্ড। ‘তোর নিশ্চয়ই মনে আছে পার্চমেন্টে এই মূর্তিটিকে অন্য সবার থেকে আলাদা বলা হয়েছে? কিন্তু অ্যানুবিস কী করে পথপ্রদর্শক হলো আর এর গোপন আত্মার ব্যাপারটিই বা কী? পরের লাইনেই অবশ্য এ কথার জবাব আছে। মনে হয় মূর্তিটি একটি পিভট (চরাড়ঃ)-এর ওপর ভর করে ঘুরতে পারে আর ওটার পেছনের একটা অংশ খুলে ফাঁকা হয়ে যায়। সংযোগ ঘটে সমাধির সঙ্গে। কিন্তু এটা তখনই সম্ভব হবে যখন মূর্তির মধ্যে জাগবে মনুষ্য সচেতনতা।’

আমরা আসলে সবাই পাগল, ভাবলো পিটার। আমি, বাবা, প্রাচীন সন্ন্যাসীরা এমনকী এই মূর্তিটাও। সমস্ত অশুভ যেন এক গিঁটঠুতে বাঁধা। ‘এর অর্থ একটাই। আমি দেবতার দিকে তাকিয়ে নিজেকে সম্মোহিত করবো। ততক্ষণ পর্যন্ত সমাহিত থাকবো যতক্ষণ পর্যন্ত না আমার আত্মা এই মূর্তির শরীরে প্রবেশ করে এবং সমাধিস্তম্ভের প্রবেশদ্বার খুলে যায়।’

ভয়ের ঠাণ্ডা একটা স্রোত যেন জমিয়ে দিলো পিটারকে।
‘তবে এটাকে উদ্ভট কোনোও চিন্তা ভেবে অবজ্ঞা করিস না। যোগীরা বিশ্বাস করেন এভাবে অন্যের শরীরে প্রবেশ করা সম্ভব। আত্মসম্মোহন সব জাতির মধ্যেই স্বীকৃত একটি বিষয়। আর সম্মোহনবিদ্যা একটি বৈজ্ঞানিক সত্য। হাজার বছরেরও আগে থেকে এই সত্যের চর্চা হয়ে আসছে। প্রাচীন সন্ন্যাসীরা সম্মোহনের ব্যাপারটি খুব ভাল জানতেন। আর আমিও এখন তাই করতে যাচ্ছি। নিজেকে সম্মোহন করব আমি এবং আমার আত্মা বা সচেতনতা মূর্তির মধ্যে ঢুকে যাবে। আর আমি তখনই শুধু সমাধিস্তম্ভ খুলতে পারব।’‘কিন্তু ওই অভিশাপ!’ বিড়বিড় করে বললো পিটার। ‘অবিশ্বাসীদের সম্পর্কে ওতে কী বলা হয়েছে তুমি তো জানোই-যারা বিশ্বাস করে না যে প্রভু অ্যানুবিস এই সমাধিস্তম্ভের পথপ্রদর্শকই শুধু নয়, রক্ষাকর্তাও বটে। এই অবিশ্বাসীদের ওপর অভিশাপ নেমে আস্যার কথাও তো বলা হয়েছে। তার কী হবে?’
‘দূর দূর ওসব খেলো কথা।’ স্যার রোনাল্ড দৃঢ় গলায় বললেন। ‘সমাধি লুটেরাদের ভয় দেখাতে ওসব অভিশাপ-টভিশাপের কথা বলা হয়েছে। যা থাকুক কপালে ঝুঁকি আমি নেবোই। তুই শুধু দেখ আমি কী করি। আমি যখন সম্মোহিত হয়ে পড়বো তখন মূর্তিটা নড়ে উঠবে এবং ওটার নিচের অংশটা খুলে যাবে। সঙ্গে সঙ্গে তুই ভেতরে ঢুকে যাবি। তারপর আমাকে জোরে ঝাঁকুনি দিলেই আমি আবার আগের অবস্থায় ফিরে আসবো।’

বাবার আদেশ অমান্য করতে পারলো না পিটার। মশালটা উঁচু করে ধরলো, আলো সরাসরি বিচ্ছুরিত হতে লাগলো অ্যানুবিসের মুখের উপর। চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকলো পিটার, দেখলো বাবা শেয়াল দেবতার চোখে চোখ রেখেছেন। পাথুরে, ঠাণ্ডা দু’ জোড়া চোখ।

দৃশ্যটা ভয়ঙ্কর : দুজন মানুষ, বারো ফুট লম্বা এক দেবতা, মাটির নিচে এক অন্ধকার ঘরে পরস্পরের দিকে কঠিন চোখে তাকিয়ে আছে। স্যার রোনাল্ডের ঠোঁট নড়তে শুরু করল। প্রাচীন মিসরীয় স্তোত্র পাঠ করছেন। অ্যানুবিসের কপালে আলো জ্বলজ্বল করছে, সেদিকে স্থির দৃষ্টিতে চেয়ে আছেন তিনি। আস্তে আস্তে তাঁর দৃষ্টি চকচকে হয়ে এল; চোখে পলক পড়ছে না, তারায় ফুটে উঠলো অদ্ভুত এক নিস্প্রাণ জ্যোতি। হঠাৎ তাঁর শরীর একদিকে নুয়ে পড়লো, যেন পৈশাচিকভাবে সমস্ত শক্তি কেড়ে নেয়া হয়েছে। আতঙ্কিত পিটার দেখলো তার বাবার চেহারা বিবর্ণ হয়ে গেছে, তিনি হাঁটু ভেঙে পড়ে গেলেন মেঝের ওপর। কিন্তু দেবতার চোখ থেকে একবারও দৃষ্টি ফেরালেন না। এভাবে কেটে গেল বেশ ক’টি মুহূর্ত। মশাল উঁচিয়ে রাখতে রাখতে পিটারের বাঁ পায়ে ঝিঁঝি ধরে গেলো।

পিটার, কিছু ভাবতে পারছে না। তার বাবাকে এর আগেও বহুবার আত্মসম্মোহন করতে দেখেছে সে আয়না আর আলো নিয়ে। কিন্তু বদ্ধ ঘরে বিপদের কোনও আশঙ্কা ছিলো না। আর এখানকার অবস্থা সম্পূর্ণ ভিন্ন। বাবা কি পারবেন মিসরীয় এই দেবতার শরীরে প্রবেশ করতে? যদি পারেনই তা হলে ওই অভিশাপ? প্রশ্ন দুটো বার বার আলোড়িত হতে থাকে পিটারের মনে। কিন্তু কোনও জবাব পায় না। হঠাৎ ব্যাপারটা লক্ষ করল সে। প্রচণ্ড ভয়ে যেন জমে গেলো। ওর বাবার চোখে মরা মানুষের শেষ চাউনি, সচেতন ভাবটা সম্পূর্ণ উধাও। কিন্তু দেবতার চোখ-অ্যানুবিসের দৃষ্টি এখন আর নিস্প্রাণ এবং পাথুরে নয়। ভয়ঙ্কর মূর্তিটা জেগে উঠেছে! ওর বাবা তা হলে ঠিকই বলেছিলেন। কাজটা করেছেন তিনি-সম্মোহনের মাধ্যমে নিজের সচেতনতাবোধ মূর্তির মধ্যে প্রবেশ করিয়েছেন। কিন্তু এখন? এরপর কী ঘটবে? বাবা বলেছিলেন তাঁর আত্মা সরাসরি সমাধিস্তম্ভে প্রবেশের পথ খুলে দেবে। কই, সেরকম তো কিছুই ঘটছে না। কারণ কী?

শঙ্কিত এবং ভীত পিটার উবু হয়ে পরীক্ষা করলো স্যার রোনাল্ডের শরীর, নিস্তেজ, নিস্প্রাণ একটা শরীর। মারা গেছেন স্যার রোনাল্ড বার্টন। ঝট করে পিটারের মনে পড়ল পার্চমেন্টের সেই ভয়ঙ্কর সাবধানবাণী :
যারা বিশ্বাস করবে না তারা মরবে। প্রভু অ্যানুবিসকে পাশ কাটিয়ে সামনে অগ্রসর হওয়া হয়তো সম্ভব হবে, কিন্তু তিনি আর অনুপ্রবেশকারীকে বাইরের পৃথিবীতে ফেরত যেতে দেবেন না। মনে রেখ, অ্যানুবিস এক অদ্ভুত দেবতা যার মধ্যে রয়েছে এক গোপন আত্মা।

গোপন আত্মা! কেঁপে উঠলো পিটার। মশালটা উঁচিয়ে ধরে সোজা শেয়াল দেবতার চোখের দিকে চাইলো। অ্যানুবিসের ঠাণ্ডা পাথুরে চোখ দুটো জ্যান্ত!

পৈশাচিকভাবে জ্বলজ্বল করছে অশুভ দেবতার দুই চোখ। ওদিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎই যেন উন্মাদ হয়ে গেল পিটার। ওর মাথা শূন্য হয়ে গেছে। কিছুই ভাবতে পারছে না। তার মাথায় দড়াম দড়াম বাড়ি খাচ্ছে শুধু একটাই ব্যাপার-তার বাবা মারা গেছেন। আর এই মৃত্যুর জন্য দায়ী ওই মূর্তিটা। যেভাবেই হোক বাবাকে হত্যা করে সে জীবন্ত হয়ে উঠেছে। বিকট চিৎকার দিয়ে সামনের দিকে ছুটে গেলো পিটার বার্টন, দমাদম ঘুসি মারতে লাগলো পাথরের মূর্তির বুকে। হাত ফেটে রক্ত বেরুতে শুরু করলো, রক্তাক্ত মুঠিতে চেপে ধরলো সে অ্যানুবিসের শীতল দুই পা, টানতে লাগলো। যেন উল্টে ফেলবে। কিন্তু এক চুল নড়লো না দানব-মূর্তি। বিকট চোখে তাকিয়ে আছে সামনের দিকে। অশ্রাব্য গালিগালাজ শুরু করলো পিটার। বিভ্রান্ত দেখাচ্ছে ওকে। কী করছে নিজেও জানে না। মূর্তিটা যেন ওর দুর্দশা দেখে আনন্দ পাচ্ছে, ভেঙচি কাটছে। পাগলের মত ওটার গা বেয়ে ওপরে উঠতে শুরু করলো পিটার। থেকে থেকে ঝাঁকি খাচ্ছে ওর শরীর, ফোঁপাচ্ছে, বাবার কথা বলছে ফোঁপাতে ফোঁপাতে। চোখে খুনের নেশা। যেন ভেঙচি কাটা মুখটাকে ধ্বংস করে দেবে।

অ্যানুবিসের মাথার কাছে পৌঁছুতে কত সময় লেগেছে জানে না পিটার। হঠাৎ ওর সম্বিত ফিরে এলো। লক্ষ করলো মূর্তিটার ঘাড়ের কাছে চলে এসেছে। পা ঝুলছে মূর্তির পেটের কাছে। উন্মাদ দৃষ্টিতে চেয়ে আছে ভয়ঙ্কর এবং জ্যান্ত চোখ দুটোর দিকে।

হঠাৎ গোটা মুখটা যেন বেঁকে যেতে শুরু করলো। ফাঁক হয়ে গেলো পাথুরে ঠোঁট, বিশাল এক গহ্বরের সৃষ্টি হলো মুখে, নড়ে উঠল হাত। লম্বা, প্রসারিত হাত দুটোর আঙুলগুলো বাঁকানো, যেন ছোবল দেবে কালনাগিনী। বিদ্যুদ্বেগে হাত দুটো পিটারকে শক্ত, পাথুরে বুকের সঙ্গে মরণ আলিঙ্গনে বেঁধে ফেললো, পরক্ষণে আঙুলগুলো চেপে বসলো ওর গলায়। হাঁ করা মুখটা নেমে এলো নিচে, ধারালো দাঁতে কামড় বসালো পিটারের ঘাড়ে। ফিনকি দিয়ে বেরিয়ে আসা উষ্ণ রক্ত ভিজিয়ে দিলো প্রতিহিংসায় উল্লসিত তিন হাজার বছরের পুরোনো অশুভ দেবতার মুখ।

পরদিন স্থানীয় লোকেরা পিটারের রক্তশূন্য, হাড়গোড় ভাঙা লাশটা আবিষ্কার করলো অ্যানুবিসের পায়ের নিচে। স্যার রোনাল্ডের প্রাণহীন দেহটাও তার পাশে চিৎ হয়ে আছে। দেবতার অভিশাপের ভয়ে সমাধিতে ঢোকার সাহস কারও হলো না। ব
1324455996_golpo1901_b.jpg
Comments
Write Comment
Leave your valued comment. Sign Up


TS Management System