Title: সব প্রশংসা শুধুই আল্লাহর

হাসানুল কাদির
বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম

সূরা ফাতিহার আয়াত সংখ্যা ৭। প্রথম ৩টি আয়াতে আল্লাহ তায়ালার প্রশংসা এবং শেষের ৩টি আয়াতে মানুষের পক্ষ থেকে আল্লাহর নিকট প্রার্থনা ও দরখাস্তের বিষয়বস্তুও সংমিশ্রণ। মধ্যের ১টি আয়াত প্রশংসা ও দোয়া মিশ্রিত।

মুসলিম শরিফে হযরত আবু হুরায়রা (রা) বর্ণনা করেছেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেছেন, আল্লাহ তায়ালা এরশাদ করেছেন, নামাজ (অর্থাৎ সুরাতুল ফাতিহা) আমার এবং আমার বান্দাদের মধ্যে দু ভাগে বিভক্ত।অর্ধেক আমার জন্য আর বাকি অর্ধেক আমার বান্দাদের জন্য।আমার বান্দাগণ যা চায়, তা তাদেরকে দেওয়া হবে। অতঃপর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, যখন বান্দাগণ বলে ‘আল হামদুলিল্লাহ’, তখন আল্লাহ বলেন, আমার বান্দাগণ আমার প্রশংসা করছে। আর যখন বলে ‘আর রাহমানির রাহীম’, তখন তিনি বলেন, তারা আমার মহত্ত্ব ও শ্রেষ্ঠত্ব বর্ণনা করছে। যখন বলে ‘মালিকি য়াওমিদ্দীন’, তখন তিনি বলেন, আমার বান্দাগণ আমার গুণগান করছে। যখন বলে, ‘ইয়্যাকা না‘বুদু ওয়া ইয়্যাকা নাসতা‘ঈন’, তখন তিনি বলেন, এ আয়াতটি আমার এবং আমার বান্দাগণের মধ্যে সংযুক্ত। কারণ এর এক অংশে আমার প্রশংসা এবং অপর অংশে বান্দাগণের দোয়া ও আরজ রয়েছে। সঙ্গে এ কথাও বলা হয়েছে, বান্দাগণ যা চাইবে, তারা তা পাইবে।
বান্দাগণ যখন বলে ‘ইহদিনাস সিরাতাল মুসতাকীম’ (শেষ পর্যন্ত), তখন আল্লাহ বলেন, এসবই আমার বান্দাগণের জন্য এবং তারাযা চাইবে, তা পাবে। -তাফসীরে মাযহারি
প্রথম আয়াতের ব্যাখ্যা
‘আলহামদুলিল্লাহ’ (সকল প্রশংসা আল্লাহ তায়ালার)। অর্থাৎ দুনিয়াতে যেকোনো স্থানে যেকোনো বস্তুর প্রশংসা করা হয়, বাস্তবে তা আল্লাহরই প্রশংসা। কেননা এ বিশ্ব চরাচওে অসংখ্য মনোরম দৃশ্য, অসংখ্য মনোমুগ্ধকর সৃষ্টি আর সীমাহীন উপকারী বস্তুসমূহ সর্বদাই মানবমনকে আল্লাহ তায়ালার প্রতি আকৃষ্ট করতে থাকে। এবং তার প্রশংসায় উদ্বুদ্ধ করতে থাকে। একটু গভীরভাবে চিন্তা করলেই বোঝা যায়, সকল বস্তুও অন্তরালেই এক অদৃশ্য সত্তার নিপুণ হাত সদা সক্রিয়।
যখন পৃথিবীর কোথাও কোনো বস্তুও প্রশংসা করা হয়, তখন প্রকৃতপক্ষে তা উক্ত বস্তুর সৃষ্টিকর্তার প্রতিই বর্তায়। যেমন কোনো চিত্র, কোনো ছবি বা নির্মিত বস্তুর প্রশংসা করা হলে প্রকৃতপক্ষে সে প্রশংসা প্রস্তুতকারকেরই করা হয়।
এ বাক্যটি প্রকৃতপক্ষে মানুষের সামনে বাস্তবতার একটি নতুন দ্বার উন্মুক্ত কওে দেখিয়ে দিয়েছে যে, আমাদের সামনে যা কিছু রয়েছে এ সব কিছুই একটি একক সত্তার সাথে জড়িত এবং সকল প্রশংসাই সে অনন্ত অসীম শক্তির। এসব দেখে কারো অন্তওে যদি প্রশংসাবাণীর উদ্রেক হয় এবং মনে করে যে, তা অন্য কারো প্রাপ্য, তবে এ ধারণা জ্ঞান-বুদ্ধিও সংকীর্ণতারই পরিচায়ক। সুতরাং নিঃসন্দেহে এ কথাই বলতে হয়, ‘আল হামদুলিল্লাহ’ যদিও প্রশংসার জন্য ব্যবহৃত হয়েছে, কিন্তু এর মধ্যে অতি সূক্ষèতার সাথে বর্ণনা করা হয়েছে যে, সকল সৃষ্টবস্তুও উপাসনাই নিষিদ্ধ করা হলো। তাছাড়া এর দ্বারা অত্যন্ত আকর্ষণীয় পদ্ধতিতে একত্ববাদের শিক্ষাও দেওয়া হয়েছে। আল- কোরআনের এ ক্ষুদ্র বাক্যটিতে একদিকে আল্লাহ তায়ালার প্রশংসা করা হয়েছে, এবং অন্যদিকে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে নিমগ্ন মানব মনকে এক অতি বাস্তবের দিকে আকৃষ্ট করে যাবতীয় সৃষ্টবস্তুর পূজা-অর্চনাকে চিরতরে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। এতদসঙ্গে অতি হেকমতের সাথে বা অকাট্যভাবে ঈমানের প্রথম স্তম্ভ ‘তওহীদ’ বা একত্ববাদেও পরিপূর্ণ নকশাও তুলে ধরা হয়েছে। একটু চিন্তা করলে বোঝা যায়, বাক্যটিতে যে দাবি করা হয়েছে, তার পক্ষে দলিলও দেওয়া হয়েছে।
‘রাব্বিল আলামীনা’ । এই ক্ষুদ্র বাক্যটির পরেই আল্লাহ তায়ালার প্রথম গুণবাচক নাম ‘রাব্বুল আলামীনের’ উল্লেখ করা হয়েছে। আরবি ভাষায় রব শব্দের অর্থ পালনকর্তা। লালন-পালন বলতে বোঝায়, কোনো বস্তুকে তার সমস্ত মঙ্গলামঙ্গলের প্রতি লক্ষ্য রেখে ধীরে ধীরে বা পর্যায়ক্রমে সামনে এগিয়ে নিয়ে উন্নতির চরম শিখরে পৌঁছে দেওয়া।
এই শব্দটি একমাত্র আল্লাহর জন্যই নির্দিষ্ট। সম্বন্ধপদ রূপে অন্যের জন্যও ব্যবহার করা চলে, সাধারণভাবে নয়। কারণ প্রত্যেকটি প্রাণী বা সৃষ্টিই প্রতিপালিত হওয়ার মুখাপেক্ষী। তাই সে অন্যের প্রকৃত প্রতিপালনের দায়িত্ব নিতে পারে না।
‘আল আলামীনা’ শব্দটি ‘আলম’ শব্দের বহুবচন। এতে পৃথিবীর যাবতীয় সৃষ্টিই অন্তর্ভুক্ত। যথাÑআকাশ-বাতাস, চন্দ্র-সূর্য, তারকা-নক্ষত্ররাজি, বিজলি-বৃষ্টি, ফেরেশতাকুল, জিন, জমিন এবং এতে যা কিছু সৃষ্টি হয়েছে। জীবজন্তু, মানুষ, উদ্ভিদ, জড়পদার্থ সবকিছুই এর অন্তর্ভুক্ত। অতএব রাব্বিল আলামীন এর অর্থ হচ্ছে, আল্লাহ তায়ালা সমস্ত সৃষ্টির পালনকর্তা। তাছাড়া একথাও চিন্তার ঊর্ধ্বে নয় যে, আমরা যে দুনিয়াতে বসবাস করছি এর মধ্যেও কোটি কোটি সৃষ্টবস্তু রয়েছে। এ সৃষ্টিগুলোর মধ্যে যা কিছু আমাদের দৃষ্টিগোচর হয় এবং যা আমরা দেখি না, সে সবগুলোই এক একটা আলম বা জগত।
তাছাড়া আরো কোটি কোটি সৃষ্টি রয়েছে, যা সৌরজগতের বাইওে , যা আমরা অবলোকন করতে পারি না। ইমাম রাজি তাফসীরে কবীরে লিখেছেন, এ সৌরজগতের বাইরে আরো সীমাহীন জগত রয়েছে। যুক্তি দ্বারা প্রমাণিত এবং একথা সর্বজনবিদিত যে, সকল বস্তুই আল্লাহর ক্ষমতার অধীন। সুতরাং তার জন্য সৌরজগতের অনুরূপ আরো সীমাহীন কতকগুলো জগত সৃষ্টি করে রাখা মোটেই অসম্ভব নয়।
উপরের আলোচনা থেকে পরিষ্কারভাবে বোঝা যাচ্ছে, ‘রাব্বিল আলামীন’ এর নিখুঁত প্রতিপালন নীতিই পূর্বের বাক্য ‘আলহামদুলিল্লাহ’র দলিল বা প্রমাণ। সমগ্র সৃষ্টির লালন-পালনের দায়িত্ব একই পবিত্র সত্তার, তাই তারিফ-প্রশাংসারও প্রকৃত প্রাপক তিনিই; অন্য কেউ নয়। এজন্যই প্রথম আয়াত ‘আলহামদু লিল্লাহি রাব্বিল আলামীন’ এ তারিফ-প্রশংসার সাথে ঈমানের প্রথম স্তম্ভ আল্লাহ তায়ালার একত্ব বা তওহীদের কথা অতি সূক্ষভাবে এসে গেছে।

* সব কাজ বিসমিল্লাহসহ আরম্ভ করতে হবে
1323594120_tafsirul-quran20111203160159.jpg
Comments
Write Comment
Leave your valued comment. Sign Up


TS Management System